মার্কিন সহায়তা স্থগিতে পূর্ব ইউরোপের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আকস্মিকভাবে সব ধরনের বিদেশী সাহায্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আকস্মিকভাবে সব ধরনের বিদেশী সাহায্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রভাব পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সহায়তার আওতায় থাকা পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। অঞ্চলটির গণতন্ত্রপন্থী সংগঠন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজের বিভিন্ন উদ্যোগসহ স্থানীয় সরকারগুলো ব্যাপক অর্থসংকটে পড়েছে। খবর এপি।

গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওইদিনই বিদেশী সহায়তা ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের নির্বাহী আদেশে সই করেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এ সহায়তা স্থগিত রাখার মূল লক্ষ্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং তথাকথিত প্রগতিশীল (ওক) কর্মসূচিগুলোকে চিহ্নিত করা। এসব কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী। নিজের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডাকে জোরেশোরে এগিয়ে নেয়ার অংশ হিসেবে ট্রাম্প এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া ও চীনেরও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ আছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, মার্কিন সহায়তা বন্ধের কারণে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো বিপদে পড়বে। ফলে সৃষ্ট শূন্যতার সুবিধা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

মলদোভার জনগণের একটি অংশ রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। দেশটির একটি গণমাধ্যম পরিচালনাকারী অক্সানা গ্রেয়াদচেঙ্কো জানান, বিদেশী দাতাদের সহায়তা গণমাধ্যমের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক টেলিভিশন চ্যানেল ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার অর্থায়নে চলে। তাই একটি পাল্টা শক্তি থাকা প্রয়োজন।

মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি অক্সানা গ্রেয়াদচেঙ্কোকে সাহায্য স্থগিতের বিষয়টি জানিয়েছে। এরপর বিকল্প উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তিনি।

অক্সানা বলেন, ‘‌সহায়তা স্থগিতের অপ্রত্যাশিত প্রভাব পড়েছে। আমরা ভেবেছিলাম তহবিলের কিছু অংশ কর্তন করা হবে। মার্কিন তহবিলের ওপর মলদোভা কতটা নির্ভরশীল, তা এনজিও, গণমাধ্যম, স্থানীয় সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থায় স্পষ্ট। তাই এটি সবার জন্যই বড় ধাক্কা।’

১৯৯০-এর দশক থেকে মলদোভা, সার্বিয়া, আলবেনিয়া, কসোভো এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো সাবেক সমাজতন্ত্রী দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র কয়েকশ কোটি ডলার অর্থায়ন করেছে। এ অর্থায়ন দেশগুলোর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সেগুলোর সংস্কার, অবকাঠামো ও জ্বালানি নিরাপত্তা প্রকল্প, ব্যবসা ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমও এ সহায়তার অধীনে এসেছে।

চিসিনাউভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বলেন, ‘‌মলদোভায় গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষা অনেকাংশে মার্কিন অর্থায়নে সম্ভব হয়েছে। পূর্ব ইউরোপের গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তিদায়ক। কারণ এটি নিশ্চিত করে এ অঞ্চলের দেশগুলো রাশিয়া বা চীনের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে না।’

মার্কিন সহায়তা স্থগিত হওয়ায় বিভিন্ন খাতে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। কসোভোর একটি প্রতিষ্ঠান বলেছে, মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়ায় পেশাগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অনুদানের সুযোগ কমে যাবে।

অঞ্চলটির এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘‌মার্কিন সহায়তা স্থগিত হওয়া কসোভোর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এটি সরকার থেকে শুরু করে বেসরকারি খাত ও শিক্ষা খাতেও প্রভাব ফেলবে।’

মলদোভার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক একটি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জানান, মার্কিন সহায়তা থেকে পাওয়া তহবিল মলদোভার বেশির ভাগ প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সংস্থা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক অর্থায়ন বিশ্লেষণ ও সংসদীয় তদারকি পরিচালনা করে।

তিনি বলেন, ‘‌মার্কিন সহায়তা বন্ধ থাকায় তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। যদি বিকল্প উৎস থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা না পাওয়া যায়, তাহলে তারা তাদের প্রকল্পগুলো আগের মতো চালিয়ে যেতে পারবে না।’

মলদোভা চলতি বছরের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে। যথাযথ তহবিল না থাকলে তারা দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে পারবে না। এতে ভোটের দিন পর্যবেক্ষণ কিংবা বিদেশী হস্তক্ষেপের বিষয়ে নজরদারি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মলদোভার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন অধ্যাপক মন্তব্য করেন, মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে রাশিয়া এ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে আরো প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যা মলদোভার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলবে।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য তহবিল বন্ধ হলে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে যাবে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, এটি মূলত বিদেশী সহায়তা বাবদ ব্যয়ের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের একটি উদ্যোগ।

আরও